ছোটনাগপুরের সামন্ততন্ত্র ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আদিবাসী কৃষক বিদ্রোহ 'উলগুলান'-এর অবিসংবাদী নেতা বিরসা মুণ্ডার ১৫০তম জন্মবার্ষিকী শুরু হচ্ছে আগামী ১৫ নভেম্বর। একই সাথে গত ৯ জুন চলে গেল তাঁর মৃত্যুর ১২৫তম দিবসটি। রাঁচি জেলার (বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের খুঁটি জেলা) খুঁটি থানার অন্তর্গত উলিহাতু গ্রামে এক মুণ্ডা পরিবারে ১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর তাঁর জন্ম। ছোটনাগপুরের জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামে যে আদিবাসী গোষ্ঠীভুক্ত পরিবারগুলি দীর্ঘ পরিশ্রমে বসতি স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ এবং কৃষিজমির জন্ম দিয়েছিল তাদের কাছ থেকে জমি ও জঙ্গলের অধিকার কেড়ে নিতে পরস্পর হাত মিলিয়েছিল স্থানীয় সামন্ত প্রভু-জমিদার-মহাজন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা। বিরসার পিতা সুগনা মুণ্ডা নিজেই ছিলেন উলিহাতু গ্রামের খুঁটকাটিদার, বা গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর প্রধান। জঙ্গলকে কেন্দ্র করে গ্রামের পত্তনে এই খুঁটকাটিদাররা ছিলেন মুখ্যভূমিকায়। তিনিও জমিদার ও মহাজনদের শোষণ, জুলুম, অত্যাচারে সকল সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অবশেষে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াতে হয় তাঁকে। উনবিংশ শতাব্দীতে ছোটনাগপুর অঞ্চলের বহু চাষি পরিবারের এ এক করুণ পরিণতি।
১৮৬৯ সালের ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকা থেকে জানা যায়, জমিদার ও মহাজনরা যা চাইত তাই দিতে হোত। ঘোড়া, পালকি, গান-বাজনা হলে তাদের জন্য, গরুর খাদ্যের জন্যও খাজনা দিতে হোত। জন্ম, বিয়ে, মৃত্যুর জন্যও কর দিতে হোত। পুজো হলে কর দিতে হোত। কোলদের উপর নির্মম অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী ও শোষিত কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বারে বারে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। উল্লেখযোগ্য লড়াইগুলি হল
চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৯-১৭৯৯), ভূমিজ বিদ্রোহ (১৮৩১-৩৩), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬) এবং ১৮৫৮ থেকে ১৮৮৯-এই তিন দশক ধরে মুণ্ডা সর্দারদের আন্দোলন যা সর্দারি লড়াই নামে পরিচিত। জমিদার ও পুলিশ প্রশাসন পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়ে এই বিক্ষোভগুলিকে দমন করে। বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে 'উলগুলান' আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সকল শোষিত মানুষের লড়াই অনেকটা সুসংহত রূপ পেয়েছিল।
বিরসার বাল্যকাল কেটেছিল আয়ুভাতুতে, তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মামাবাড়িতে। আয়ভাতুর পাশের গ্রাম শালগাতে এলাকার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি জয়পাল নাগের পাঠশালায় তার পড়াশুনার শুরু। খ্রিস্টধর্মের এক প্রচারকের সহায়তায় তিনি বুর্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন। পরে আরও উচ্চ শ্রেণিতে পড়ার জন্য ভর্তি হন চাঁইবাসার বোর্ডিং স্কুলে। তাঁর অধ্যবসায় ও মেধা চাঁইবাসাতেও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু এই মিশনে তাঁর বেশি দিন পড়া হয়নি। মিশনের শিক্ষা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাঁর পরিচিতি ঘটিয়েছিল। কিন্তু তিনি ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে মাথা নিচু করতে রাজি ছিলেন না। সে সময় ইউরোপিয়ান মিশনারিরা আদিবাসী যুবকদের বশে আনতে অতীতের বিদ্রোহগুলির প্রতি নানা কুমন্তব্য করতেন। একদিন মিশনের প্রার্থনা সভায় ফাদার নট্রট সর্দারি আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা কটু মন্তব্য করে বলেন, 'সর্দাররা বেইমান'। বিরসা সাথে সাথেই তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে মিশন ছাড়তে হয়েছিল। চাঁইবাসার মিশন থেকে ফিরে বিরসা এক ধনী মুণ্ডা পরিবারে এক বছরের জন্য গৃহভৃত্যের কাজ করেছিলেন। পরে তিনি বন্দগাঁও-এর জমিদারের নায়েব আনন্দ পাঁড়ের বাড়িতে গবাদি পশু চারণের কাজ শুরু করেন। আনন্দ পাঁড়ে ছিলেন বৈষ্ণব। এই বাড়িতে থাকাকালীন বিরসা আয়ুর্বেদ শাস্ত্র পড়েন এবং গাছ গাছড়া চেনা ও অসুখ সারানোর বিভিন্ন ঔষধ সম্বন্ধেও কিছু জ্ঞান আহরণ করেন।
বন্দগাঁও-এ থাকাকালীন তার জমিদারের দরবারে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। জমিদারের ধন-সম্পত্তি, বিলাস ব্যসন, অপচয় দেখেছিল। এই সম্পদ আহরণে গরিব, অপরদিকে এই সম্পদ আহরণে শোষিত মানুষের উপর জমিদারের শোষণ-জুলুম-অত্যাচার দেখেছিল। সেই সময় সরকার ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষায় এই অঞ্চলে জঙ্গল আইন লাগু করে। এর মধ্যে দিয়ে সরকার আদিবাসী সহ সাধারণ মানুষের জঙ্গলে প্রবেশের পরম্পরাগত অধিকার কেড়ে নেয়।
এ জন্য গরিব শোষিত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিরসাও সিরগিদা গ্রামের রায়তদের সংগঠিত করে জঙ্গল অফিসে বিক্ষোভ দেখান। এই ভাবেই বিরসার সক্রিয় আন্দোলনে হাতেখড়ি হয়। এই সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলিকে সরকার সহজেই দমন করে।
অদিবাসী এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষের সরল ধর্মীয় বিশ্বাস ও তাকে ভিত্তি করে থাকা মূল্যবোধকে হাতিয়ার করেই বিরসা মুণ্ডা ছোটনাগপুরের আদিবাসী সহ শোষিত মানুষদের সংগঠিত করেছিলেন। এর ভিত্তিতে দৈনন্দিন জীবনে পালন করার জন্য তিনি কিছু নিয়ম-নীতি প্রণয়ন করেন। সেগুলির প্রধান কয়েকটি হল-১) সমাজে প্রচলিত পশুবলি বন্ধ করা। ২) চাল থেকে তৈরি হাঁড়িয়া সহ সমস্ত প্রকার মদ্যপান বন্ধ করা। ৩) চুরি না করা। ৪) মিথ্যা কথা না বলা। ৫) গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা। ৬) সমাজের সকল মানুষকে ভালোবাসা ও কারোর প্রতি হিংসাপরায়ণ না হওয়া। ৭) শরীর ও মনকে শুদ্ধ রাখা। ৮) বহু বোঙার (দেবতা) পরিবর্তে সিঙ বোঙার উপাসনা করা প্রভৃতি। তাঁর প্রচারিত এই নিয়ম-নীতি আদর্শ বিরসা ধরম এবং তাঁর অনুগামীরা বিরসাইত নামে পরিচিত হয়।
ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি বিরসা তাঁর অনুগামীদের নিয়ে জরা, ব্যাধি, মহামারিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর সম্বল ছিল মিশন স্কুল থেকে শিখে আসা স্বাস্থ্যবিধি, আনন্দ পাঁড়ের কাছ থেকে অর্জিত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের জ্ঞান। দিনরাত্রি সেবা শুশ্রুষা করে মহামারিতে আক্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী বহু মানুষকে তিনি বাঁচিয়েছিলেন। এভাবে বিরসার প্রতি এলাকার মানুষের গভীর আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে ওঠে। ছোটোনাগপুরের মানুষ তাকে 'ধরতি আবা' (বিশ্বপিতা) হিসাবে মান্যতা দিতে থাকে। সর্দারি আন্দোলনের নেতারাও তাঁকে নেতা হিসাবে মেনে নেয়।
এই অঞ্চল জুড়ে বিরসার নামে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিরসার জনপ্রিয়তা দেখে জমিদার, মহাজন, চার্চ ও প্রশাসনের টনক নড়ে। এই সংবাদ অতি দ্রুত ছোটনাগপুরের কমিশনারের কাছে পৌঁছায়। বিরসার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পুলিশ বিরসাকে চালকাদ গ্রামে গ্রেপ্তার করতে এলে তাঁর অনুগামীদের প্রবল বাধায় পুলিশ বাহিনী ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই ঘটনায় জমিদার, মহাজন ও চার্চ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। ২২ আগস্ট ১৮৯৫ বিরসার নামে পুনরায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ২৪ অরক্ষিত বিরসাকে গ্রেপ্তার করে। সাথে তাঁর ১৫ জন আগস্ট রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে বিশাল পুলিশ বাহিনী অনুগামীকেও গ্রেফতার করে। বৃহস্পতিবার বিরসাইতরা বিভিন্ন গ্রামে ধর্মীয় সভা পরিচালনা করতে যেত তাই বিরসার কাছে বেশি অনুগামী থাকত না। তাই এই বৃহস্পতিবারকেই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বেছে নিয়েছিল। প্রথম দিন তাঁদের খুঁটি জেলে রেখে পরে রাঁচি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ২৪ অক্টোবর ১৮৯৫ বিরসার মুক্তির দাবিতে সর্দাররা খুঁটি থানা অভিযান করে। এই সময় আন্দোলনকে খতম করার জন্য গ্রামে গ্রামে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়। সেই পুলিশ ক্যাম্পের খরচ গরিব আদিবাসীদের দিতে বাধ্য করা হয়। ১৯ নভেম্বর ১৮৯৫, রাঁচি আদালতের রায়ে বিরসা মুণ্ডার দুই বছরের জেল ও ৫০ টাকা জরিমানা ধার্য হয়।
৩০ নভেম্বর ১৮৯৭ বিরসা জেল থেকে ছাড়া পান। তাঁর অনুগামীরাও হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পান। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন সমগ্র এলাকা দুর্ভিক্ষ কবলিত। সাথে বসন্ত মহামারির রূপ নিয়েছে। এই দুঃসময়েও এলাকার মানুষগুলি জমিদার, মহাজন ও সরকারের শোষণের জাঁতাকল থেকে রেহাই পায়নি। বিরসা ও তাঁর অনুগামীরা ক্লান্তি-শ্রান্তিহীনভাবে সমস্ত বিপদকে উপেক্ষা করে এইসব আর্ত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
বিরসা নতুন উদ্যমে তাঁর প্রবর্তিত নীতি ও অনুশাসনগুলির প্রচার শুরু করে দিলেন। দেখলেন প্রায় সমস্ত গ্রামেই মুণ্ডা সহ সকল গরিব শোষিত মানুষের চরম দুরবস্থা। এই দুর্দশা দূর করতে ও নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে বিরসা সকলকে সংগঠিত হওয়া, সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য তৈরি হওয়া এবং প্রয়োজনে জীবন দিয়ে অধিকার রক্ষার আহ্বান জানান। এই আহ্বানে সমগ্র মুণ্ডা সমাজ প্রতিবেশী শোষিত জনগণকে নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। বিদ্রোহের বার্তা প্রচারের জন্য বিশ্বস্ত অনুগামীদের মধ্য থেকে একদল প্রচারক নিয়োগ করে। জমিদার, মহাজন, জায়গিরদার, ঠিকাদার, চার্চ ও ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে এই সব সভার আয়োজন হতো। অবশেষে এল সেই মহালগ্ন, ২৪ ডিসেম্বর ১৮৯৯। বিরসার আহ্বানে সরকার, মিশনারি এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে শুরু হয় সশস্ত্র লড়াই। বিদ্রোহীদের আক্রমণে বেশ কিছু সেপাই, চৌকিদার, জমিদার, মহাজন, মিশনারি হতাহত হয়। বিদ্রোহীরা খুঁটি থানা জ্বালিয়ে দেয়। ওই দিন রাঁচি, সোনেপুর, চাঁইবাসা, খুঁটি প্রভৃতি জায়গায় যে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তা ৭জানুয়ারি ১৯০০ পর্যন্ত পুরো ছোটনাগপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন এই বিদ্রোহ দমন করতে পারেনি। অবশেষে পুরো দুই কোম্পানি সৈন্য নেমেছিল এই বিদ্রোহ দমনে।
বিরসা সহ শত শত বিরসাইত আশ্রয় নিয়েছিলেন শৈল রাকাব পাহাড়ে। সেখানে মহিলা ও শিশুরাও ছিল। ৯ জানুয়ারি সন্ধান পেয়ে ইংরেজবাহিনী শৈল রাকাব পাহাড় ঘিরে ফেলে তাদের আত্মসমর্পন করতে বললে তাঁরা এই আদেশ ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলেন। ইংরেজ সেনাপতি গুলি বর্ষণের আদেশ দেন। তীর-ধনুক-বর্শা হাতে তারা অকুতোভয়ে লড়াই করেছিল। সম্মুখ সমরে শত শত বিরসাইত বীরের মৃত্যু বরণ করেছিলেন। মহিলারাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। অনুগামীদের সহযোগিতায় বিরসা শৈল রাকাব পাহাড় থেকে আত্মগোপন করতে পেরেছিলেন।
৩ মার্চ ১৯০০, ব্রিটিশ সরকার বিরসাকে গ্রেপ্তার করে। লোকচক্ষুর অন্তরালে অন্ধকার কারাকক্ষে সংগঠিত হল এক ঘৃণ্য নাটক। ৯ জুন হঠাৎ শোনা গেল জেলের অভ্যন্তরে বিরসা কলেরায় আক্রান্ত হয়ে রক্ত বমি করে মারা গেছেন। যদিও প্রশাসন সবসময় বলে গেছে কলেরাতে মৃত্যু, কিন্তু জেলের রেকর্ড বুকে কলেরার চিকিৎসার তথ্য পাওয়া যায়নি। বহু ঐতিহাসিক যথার্থভাবেই মনে করেন বিরসাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের জানা ছিল যে, বিরসাকে ফাঁসি দিলে তাদের এক বিরাট বিক্ষোভের মধ্যে পড়তে হবে। সে কারণেই ব্রিটিশ সরকার সভ্যতার এক সংগ্রামী সন্তানের এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তাকে কলেরায় মৃত্যুর গল্পের আড়ালে ঢেকে দিতে চেয়েছিল। বিরসা মুণ্ডার জীবনচরিত লেখক কুমার সুরেশ সিং লিখেছেন- "J.A. Crevan who was entrusted with the enquiry into Birsa's death,... could not come to any conclusion, and he opined that this matter would always remain a mystery."
বিরসা মুণ্ডার লড়াই ছোটনাগপুর অঞ্চলকে তোলপাড় করে দিয়েছিল। মুণ্ডা সহ ছোটনাগপুর অঞ্চলের সমস্ত এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল জমিদার, মহাজন, মিশনারি এবং ইংরেজ শাসকদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ ও ঘৃণা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যেও বিরসা মুণ্ডার জীবন সংগ্রাম ও 'উলগুলান' অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনের বক্তব্য থেকেও জানা যায় অনেক কিছু। তিনি বলেছেন, "Acknowledging his crucial role in awakening the masses of Chhotanagpur against the British rule, the Indian national Congress and the Forward Block observed Birsa Day in 1940 with great enthusiasm. Paying tribute to Birsa Munda, the Indian National Congress named the main gate of its Ramgarh Session in 1940 as Birsa Gate and published stories of his eventful life which was circulated among the delegates." (National Biography, Birsa Munda - K. S. Singh).
বর্তমানেও বিরসা মুণ্ডার জীবনসংগ্রাম সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। জমিদার, মহাজন, মিশনারি ও অন্যান্য শোষক-শাসকদের হাত থেকে মুন্ডা ও তাদের প্রতিবেশীদের জমির অধিকার রক্ষার অন্দোলন 'সর্দারি লড়াই' সম্বন্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদ বিরসা করেছিলেন ছাত্র জীবনেই। আদিবাসী ও গরিব মানুষের কাছ থেকে জঙ্গলের অধিকার কেড়ে নিয়ে সরকার এবং ব্যবসায়িক সংস্থার মুনাফার উদ্দশ্যে ব্রিটিশ সরকার জঙ্গল আইন লাগু করলে তার প্রতিবাদে কিশোর বিরসা সিরগিদা নামক একটি গ্রামের গ্রামবাসীদের সংগঠিত করে বন অফিসে বিক্ষোভ দেখায়।
ব্রিটিশ শাসনকালে একদিকে যেমন জমিদার, মহাজন, ঠিকাদার, মিশনারিরা আদিবাসী ও গরিব সাধারণ মানুষের জমির অধিকার কেড়ে নিয়েছে তেমনি অপরদিকে বনজ সম্পদ থেকে মুনাফা লাভের জন্য জঙ্গলের উপর আদিবাসী ও বনবাসীদের অধিকার খর্ব করে সরকারি কর্তৃত্ব কায়েম করার জন্য আইন প্রণয়ন ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই শুরু হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের সরকারও ব্রিটিশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে।
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আদিবাসী ও গরিব মানুষের এক বিশাল অংশকে জীবন ধারণের জন্য জঙ্গলের উপর নির্ভর করতে হয়। অথচ জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল এই রকম কয়েক লক্ষ আদিবাসী ও বনবাসী পরিবার জঙ্গলের অধিকার আইনের উপর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে ভিটেমাটি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে উদ্বাস্তু হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নমূলক কাজের নামে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং জঙ্গল ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই এক কোটির বেশি আদিবাসী ও গরিব মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। তারা যথাযথ পরিমাণে ক্ষতিপূরণও পায়নি যার সাহায্যে নিজেদের ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাদের অধিকাংশই এখন দিনমজুর বা পরিযায়ী শ্রমিক। অনেকেই শহরের ফুটপাথের বাসিন্দা। বর্তমানেও জঙ্গল ও তৎসংলগ্ন এলাকার গরিব সাধারণ জনগণ জীবন-জীবিকার জন্য জঙ্গলের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। সাংস্কৃতিক ও পরম্পরাগত সম্পৃক্ততা এবং নিজস্ব স্বার্থবোধ থেকেই তারা জঙ্গলকে রক্ষা করে আসছে। অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে যে জঙ্গল ও তৎসংলগ্ন এলাকার ৯০ শতাংশ গরিব মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। (ফরেস্টেশন ফ্যাক্টস অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৪ (গ্লোবাল ডেটা) ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, টোনার বাজ)।
ব্রিটিশ আমলে বনজ দ্রব্য থেকে মুনাফা অর্জনের জন্য যে জঙ্গল ধ্বংস শুরু হয়েছিল তা এখনও পর্যন্ত চলেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে ২৩ লক্ষ হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়ে গেছে (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ মে, ২০২৪)। গত ২৬ জুলাই ২০২৩ বন (সংরক্ষণ) সংশোধনী বিল-২০২৩ সংসদের বাদল অধিবেশনে লোকসভায় পাশ করিয়ে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই বিল আইনে পরিণত হওয়ার সাথে সাথেই (১২ আগস্ট, ২০২৩) ওড়িষার রায়গদা জেলার সিজিমালি পাহাড়ে বেদান্ত গোষ্ঠী বনভূমির দখল নিতে যায়। অপর এক প্রকল্পের জন্য আদানি গোষ্ঠী ওড়িষারই রায়গদা ও কালাহান্ডি জেলায় অবস্থিত কুক্রমালি পাহাড়ে বনভূমির দখল নেওয়ার চেষ্টা করে। গ্রামবাসীরা প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে এবং বনভূমি ধ্বংস রুখে দেয়। ছত্তিশগড়ের হসদেও জঙ্গল ধ্বংসের কথা এবং স্থানীয় আদিবাসী ও গরিব গ্রামবাসীদের প্রতিরোধের কথা বহুল প্রচারিত ঘটনা। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারতে মোট বৃক্ষ আচ্ছাদনের ক্ষতির ৯৫ শতাংশ প্রাকৃতিক বনভূমির মধ্যে ঘটেছে। (গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ রিপোর্ট, খান গ্লোবাল স্টাডিজ, ২২ এপ্রিল, ২০২৪)।
বৃক্ষ আচ্ছাদন সংকুচিত হওয়া একটি বিশ্বব্যাপী ঘটনা। পৃথিবী জুড়ে '১৯৯০-২০১০-এর মধ্যে বছরে গড়ে ১৫.৫ মিলিয়ন হেক্টর বন, ২০১০-২০১৫ এর মধ্যে গড়ে ১২ মিলিয়ন হেক্টর বন, ২০১৫-২০২০ এর মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১০ মিলিয়ন হেক্টর বন ধ্বংস হয়েছে।' (ফরেস্টেশন ফ্যাক্টস অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৪ (গ্লোবাল ডেটা) ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, টোনার বাজ)। 'বন ধ্বংসের চারটি প্রধান কারণ হল- ১) কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাড়ি তৈরির জন্য। ২) কৃষিজমির জন্য জঙ্গল সাফ করা হয়েছে। (এর মধ্যে রয়েছে কৃষি-সম্পর্কিত শিল্প, যেমন পেপার মিল এবং চিনি শোধোনাগার)। ৩) গবাদি পশুর জন্য চারণভূমি তৈরি করতে বন পরিষ্কার করা হয়েছে। ৪) দাবানলে পুড়ে যাওয়া বন।" (ওই)
বিশ্বব্যাপী বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলন বিস্তৃতি পাচ্ছে ও শক্তিশালী হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত প্রধানত দরিদ্র বনবাসী এবং আদিবাসীরাই প্রতিবাদ করছে, আন্দোলন গড়ে তুলছে। পরিবেশকর্মী ও পরিবেশ সচেতন নাগরিকরাও এই আন্দোলনকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অন্দোলনের পরিপূরক হিসাবে সবদিক থেকে সাহায্য করছেন। বিরসা মুণ্ডার জীবন-সংগ্রাম আদিবাসী, চিরাচরিত বনবাসীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনের সৈনিকদের প্রেরণার উৎস। সাথে সাথে পরিবেশকর্মী ও পরিবেশ সচেতন নাগরিক, যারা কর্পোরেটদের মুনাফার লালসা থেকে জঙ্গলকে রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলছেন তাদের কাছেও বিরসা মুন্ডার জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। আজ পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ যে কর্মকাণ্ড বর্তমান মুনাফা লোভী শাসকরা চালিয়ে যাচ্ছে তা গোটা মানব জাতির পক্ষেই অত্যন্ত উদ্বেগের। বিরসা মুণ্ডার ১২৫তম শহিদবর্ষ এবং ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর জীবন-সংগ্রামকে জল-জমি-জঙ্গল রক্ষার মধ্য দিয়ে পরিবেশ রক্ষা তথা মানব সভ্যতা রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
(পথিকৃৎ পত্রিকার জুলাই ২০২৪ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com